English Version

শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষসহ ৮ জনকে দুদকে তলব

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:: হবিগঞ্জ শেখ হাসিন মেডিকেল কলেজের সাড়ে ১৫ কোটি টাকার টেন্ডার কেলেংকারির ঘটনায় কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. আবু সুফিয়ানসহ ৮ জনকে তলব করেছে দুদক। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই কার্যালয়ে কর্মরত উপ পরিচালক শামসুল আলমকে প্রধান করে হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের টেন্ডার দুর্নীতির তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের প্রধান শামসুল আলম গত বুধবার পাঠানো চিঠিতে তাদেরকে তলব করেন। দুই দিনে টেন্ডার কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আগামীকাল রোববার টেন্ডার কমিটির বাজার দর যাচাই টিমের সদস্য ডা. জাহাঙ্গীর, ডা. শাহীন ভ’ইয়া, ডা. প্রানকৃষ্ণ , ডা. পংকজ কান্তি গোস্বামী তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হবেন। পরদিন সোমবার টেন্ডার কমিটির প্রধান ডা. আবু সুফিয়ান, সদস্য সচিব ও হবিগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক ডা. নাসিমা খানম ইভা, সদস্য ডা. হালিমা ও ডা. কদ্দুছকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে ।

এর আগে তদন্ত টিমের কাছে কলেজ কর্তৃপক্ষ টেন্ডার সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র ঢাকায় পাঠিয়েছে। এদিকে মেডিকেল কলেজের জিনিসপত্র কেনাকাটায় পাতানো টেন্ডারের মাধ্যমে বাজার দর থেকে কয়েকগুন বেশী মূল্যে জিনিসপত্র কেনার খবর সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিযায় প্রকাশিত হলে সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়। নড়েচড়ে উঠে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় ও দুদক। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় যুগ্ম সচিব আজম খানকে প্রধান করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তিনি গত মাসে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের বই, কম্পিউটার, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনা কাটায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করেছেন।

দুদক প্রাথমিক তদন্ত করে এর সত্যতা পায়। এমতাবস্থায় ব্যাপক তদন্তের জন্য দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ পরিচালক শামসুল আলমকে প্রধান করে একটি টিম গঠন করেছে।

উল্লেখ্য যে, হবিগঞ্জবাসীর বহু প্রত্যাশিত শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ঘোষনার পর ২০১৮ সালের ১০ই জানুয়ারী প্রথম বর্ষের (২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ) ক্লাস শুরু হয়। ওই বছরের মে মাসে বইপত্র, জার্নাল, কম্পিউটার . ফার্নিচার, এসি সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সাড়ে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। জিনিসপত্র কিনতে দুটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় দরপত্র আহ্বান করেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও দরপত্র কমিটির সভাপতি ডা. মো. আবু সুফিয়ান। দরপত্রে মোট ৭টি প্রতিষ্টান অংশ নেয়। এরমধ্যে তিনটি প্রতিষ্টানকে উপযুক্ত দরদাতা (রেসপনসিভ) হিসেবে গ্রহন করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি।

এতে দেখা যায়, ঢাকার শ্যামলী এলাকার বিশ্বাস কুঞ্জছোঁয়া ভবনের ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ নামক ঠিকাদার প্রতিষ্টান সবচেয়ে বেশী মালামাল সরবরাহ করেছে। প্রতিষ্টানটি বইপত্র, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র, মেডিকেল ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে বিল নিয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪শ ৯ টাকা।

সরজমিনে দেখা যায়, সরবরাহকৃত বিভিন্ন মালামালের মধ্যে ৬৭টি লেনেভো ল্যাপটপের (মডেল ১১০.কোর আই ফাইভ, সিক্র জেনারেশন) মূল্য নেয়া হয়েছে ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫শ টাকা। প্রতিটির মূল্য পড়েছে ১লাখ ৪৮ হাজার ৫শ টাকা। ঢাকার কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রয়কারি প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা লিমিটেডের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেছে এই মডেলের ল্যাপটপ তারা বিক্রি করছেন মাত্র ৪২ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকা সূল্যের এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডব্লিউ) দাম নেওয়া হয়েছে ২লাখ ৪৮ হাজার ৯শ টাকা। ৫০জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এক্সিরকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিষ্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। জনপ্রতি চেয়ার টেবিল ও সাউন্ড সিষ্টেমের ব্যয় পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪শ টাকা। চেয়ারগুলোতে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলো কোন প্রতিষ্টানের এর কোন ষ্টিকার লাগানো নেই।

দেশের নামীদামি ফার্নিচার প্রতিষ্টান হাতিল ও রিগ্যালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব চেয়ারের মূল্য অর্ধেকের চেয়েও কম। এছাড়া বিলের তালিকায় ৬ নম্বরে আবারো কনফারেন্স সিষ্টেম নামে ৫০ জনের জন্য (জনপ্রতি ২১ হাজার ৯শ টাকা) ১০লাখ ৯৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত সাধারন মানের ১৫টি বুক সেলফের মূল্য ৬ লাখ ৬০ হাজার, ৫টি ষ্টিলের আলমিরা ২ লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি ষ্টিলের ফাইল কেবিনেট ৪ লাখ ২২ হাজার, ২৫টি ষ্টিলের র‌্যাক ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্টানটি ৬৪৭৫ টি বইয়ের জন্য ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬শ ৬৪ টাকা । শুধু তাই নয় মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাষ্টিকের মডেলের মূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা নিয়েছে। দেশের বাজারে ‘পেডিয়াটিক সার্জারী (২ ভলিয়মের সেট) বইটির দাম ৩৩ হাজার টাকা । নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫শ ৫০ টাকা।

রাজধানীর মতিঝিলের মঞ্জরী ভবনের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্টান, ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি কার্লজিস প্রিমো ষ্টার বাইনোকোলার মাইক্রোস্কোপের মূল্য নিয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩শ ২৫ টাকা। বাজারে এর মূল্য ১লাখ ৩৯ হাজার ৩শ টাকা। জেনারেল কোম্পানীর শোরুমে ২ টন স্পিল্ট টাইপ যে এসির মূল্য ৯৮ হাজার টাকা। পুনম ইন্টারন্যাশনাল একই কোম্পানী ও মডেলের এসির দাম ১লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টির মূল্য নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ওয়ালটনের যে মডেলের ফ্রিজ ৩৯ হাজার ৩শ ৯০ টাকা। একই কোম্পানীর ও মডেলের ফ্রিজের মূল্য গুনতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। এরকম ৬টি ফ্রিজ কেনা হয়। ল্যাবরেটরীতে ব্যবহারের জন্য ১০ হাজার টাকার ডিজিটাল ওয়েইং (ওজন মাপার যন্ত্র) মেশিন ৬লাখ ৪০ হাজার টাকা দাম ধরা হয়েছে।

 

 

সর্বশেষ সংবাদ