English Version

অতি মহামারিতে রূপ নিচ্ছে ডায়াবেটিস: আক্রান্ত ৪ কোটি!

নিউজ ডেস্ক:: রাজধানীর আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেনের বাড়ির গৃহপরিচারিকা মধ্যবয়সী আলেয়া খাতুন। কয়েকমাস আগেই গ্রাম থেকে এসে তার বাসায় কাজ নেন। সম্প্রতি তার পেটে টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসকের কাছে গেলে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। অস্ত্রোপচারের আগে অপারেশনের জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন কি-না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন তিনি উচ্চ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সারাজীবন গ্রামে কাটানো আলেয়া খাতুন স্বপ্নেও ভাবেননি তার ডায়াবেটিস হবে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ডায়াবেটিস কমিয়ে তবেই অস্ত্রোপচার হয় তার। এটি কোন গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা।

এক সময় ডায়াবেটিস বড় লোকের রোগ এবং রোগটি শহরের মানুষের মধ্যেই বেশি হয় এমন কথা লোক মুখে শোনা গেলেও সময়ের পরিক্রমায় ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যার ব্যবধান শহর-গ্রাম ও ধনী-দরিদ্রের মাঝে কমে এসেছে। শহরের মতো গ্রামের মানুষও এখন আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এক সময় গ্রামের মানুষ নিজের জমিতে চাষ করা চাল, ডাল, পুকুর, খাল-বিলের মাছ, বাড়ির আঙিনায় কিম্বা জমিতে চাষ করা তাজা শাকসব্জি খাওয়াতে অভ্যস্ত থাকলেও আধুনিকায়নের ফলে তারাও এখন ফাস্ট ফুড কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এক সময় চা খেতেও গ্রামের ছোট্ট কাঁচা রাস্তা দিয়ে দু’মাইল পায়ে হেঁটে দূরের বাজারে গেলেও এখন শহরের মতো পাকা রাস্তা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল বা গাড়িতে যাতায়াত করেন। আধুনিকায়নের আশীর্বাদ এখন অভিশাপ হয়ে দেখা দিচ্ছে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও কায়িক পরিশ্রম হ্রাস পাওয়াসহ নানা কারণে শহর ও গ্রামে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যার ব্যবধান অনেক কমে এসেছে।

দেশে জাতীয়ভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের কোনো পরিসংখ্যান নেই। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ছোটখাট গবেষণা জরিপ ও অনুমিত পরিসংখ্যান অনুসারে শতকরা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলা হতো।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতি (বাডাস) গত বছর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে নভেম্বর মাস জুড়ে দেশের প্রতিটি উপজেলাসহ সর্বমোট ৮০০ স্পটে মোট ১ লাখ লোকের (যাদের ডায়াবেটিস নেই) ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে। গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি ৪ জন মানুষের মধ্যে ১ জন (অর্থাৎ ২৫ শতাংশ) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। দেশের মোট জনসংখ্যার হিসেবে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের মোট সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি।

গবেষণা সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক আক্রান্ত চট্টগ্রামে ও সর্বনিম্ন সিলেটে। যে ১ লাখ মানুষের ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা ৭০ জন এ রোগটি সম্পর্কে জানেন। কিন্তু খুব ভালোভাবে জানেন মাত্র ৩৯ শতাংশ মানুষ। যাদের ওজন বেশি ও কায়িক পরিশ্রম কম করেন এবং যাদের পরিবারে ডায়াবেটিস রোগি রয়েছে তাদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার বেশি।

১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আসুন পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি। এর প্রাক্কালে আজ বুধবার রাজধানীর বারডেম হাসপাতাল মিলনায়তনে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাডাস সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস অতিমহামারি আকার ধারণ করছে। এক সময় এ রোগটি অপ্রতিরোধ্য বলা হলেও বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হওয়ায় এটি প্রতিরোধযোগ্য।

এ রোগ প্রতিরোধের জন্য ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ডায়াবেটিস হলে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও কায়িক পরিশ্রমের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলে সুস্থ থাকা সম্ভব। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন প্রাণহানির কারন হতে পারে। এ কারণে অতি মহামারি রোগটি প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে দেশব্যাপী ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

সর্বশেষ সংবাদ