English Version

এবার সুন্দরবনের আরও কাছে বিদ্যুৎ প্রকল্প!

নিউজ ডেস্ক:: নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির হুমকিতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। সরকারের দাবি, রামপাল প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। ফলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। তারপরও সম্প্রতি জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে।

এই ঝুকির মুখেই সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সাড়ে চার কিলোমিটারের মধ্যে একটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১০০ মেগাওয়াটের ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে পাওয়ারপ্যাক-মুতিয়ারা নামে একটি বেসরকারি কোম্পানি। এখানে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। পরিবেশ অধিদপ্তরও এ প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র বিষয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছে।

পাওয়ারপ্যাক এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটির অনুমোদন পেয়েছিল ২০১২ সালে। সে সময় এটি ঢাকার কেরানীগঞ্জে নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু উদ্যোক্তারা নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পরে বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা বারবার বাড়িয়ে নেয় কোম্পানি। ২০১৭ সালের দিকে পাওয়ারপ্যাক এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবনের পাশে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপনের জন্য সরকারি সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির কাছে আবেদন করে।

এ বিষয়ে পিডিবির প্রাথমিক সম্মতি পেয়ে তারা পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) সম্পন্ন করে। গত ২৮ মার্চ তা অনুমোদনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। এর আগে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ইআইএ’র কার্যপরিধি অনুমোদিত হয়।

মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলটি মোংলা বন্দরসংলগ্ন মোংলা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) পাশেই। ২০৫ একর এলাকা নিয়ে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হয়েছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ জমি নেওয়া হয়েছে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি আগামী ৫০ বছরের জন্য উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পেয়েছে পাওয়ারপ্যাক। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও পাওয়ারপ্যাকের মধ্যে চুক্তি হয়। এই অর্থনৈতিক অঞ্চল খুলনা বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার, রামপালে নির্মাণাধীন খানজাহান আলী বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে।

প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইআইএ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর দেখতে পায়, প্রকল্পটি সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনের প্রান্তসীমা থেকে সাড়ে চার কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত, যা সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মধ্যেই পড়েছে। এ প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র দিতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তাই সংস্থাটি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে পত্র দিয়ে এ বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে।

গত ৫ মে পরিবেশ ও বন সচিবকে লেখা এ পত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ এর তফসিল-১ অনুযায়ী পাওয়ারপ্যাকের এ প্রকল্পটি ‘লাল’ বা বিপজ্জনক শ্রেণিভুক্ত। জাতীয় পরিবেশ কমিটির ৪র্থ সভার সিদ্ধান্ত (৩.৪.৩) অনুসারে সুন্দরবন ইসিএ’র মধ্যে লাল শ্রেণির যেমন ট্যানারি, ডাইং ও ওয়াশিং, সিমেন্ট, তামাক, ইট, টায়ার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাইরোলাইসিস জাতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে করা রিট মামলায় (১২৪৬৭/২০১৭) সুন্দরবন ইসিএতে কোনো ধরনের নতুন শিল্প স্থাপন না করার নির্দেশনা রয়েছে।

এ ছাড়া ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার সুন্দরবন এলাকার সামগ্রিক পরিবেশগত সমীক্ষা (এসইএ) সম্পন্নের আগে সুন্দরবনের ইসিএ ও তার আশপাশে বড় আকারের শিল্প-কারাখানা স্থাপন না করতে বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্য কমিটির কাছে বাংলাদেশ সরকার যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, এসইএ সম্পন্ন হওয়ার আগে সুন্দরবনের সংকটাপন্ন এলাকায় বড় শিল্প-কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু পাওয়ারপ্যাক অর্থনৈতিক অঞ্চল এ বিষয়ে আদালতে রিট মামলা (৫৫৮১/২০১৮) করে। ওই রিট মামলায় পাওয়ারপ্যাকের অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে শিল্প স্থাপনে পরিবেশগত ছাড়পত্র দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আইনগত বিধিনিষেধ, আদালতের নির্দেশনা ও ইউনেস্কোর শর্ত- সব মিলিয়ে এ প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়ে জটিলতায় পড়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তাই সংস্থাটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন পরিচালক বলেন, আইন অনুসারে ইসিএ’র মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে না। কিন্তু সরকার এই এলাকার মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে। এখন উদ্যোক্তা পরিবেশ ছাড়পত্র বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা নিয়ে এসেছে। ফলে ক্ষতিকর জেনেও পরিবেশ অধিদপ্তর অনুমোদন দিতে বাধ্য হচ্ছে। তার পরও সরকারের সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চ মহলের পরামর্শ নিয়েই সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ে পত্রটি পাঠিয়েছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ। তিনি সম্প্রতি অন্য সংস্থায় বদলি হয়েছেন। বর্তমানে মহাপরিচালকের দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন একেএম রফিক আহম্মদ। দু’জনের সঙ্গে কথা বলতে সোমবার তাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

অবশ্য এ বিষয়ে পরিবেশ সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী বলেন, এ মুহূর্তে তার কাছে তথ্য নেই। প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ সফিউল আলম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন তাদের আওতাধীন হলেও ইসিএ দেখার দায়িত্ব তাদের নয়। এটা পরিবেশ অধিদপ্তর দেখভাল করে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ প্রকল্পের অনুমোদন দিতে পারে। তবে পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি দেখার দায়িত্ব পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং তাদের অধিদপ্তরের। তারা যদি মনে করে, বনের ক্ষতি হবে না- তাহলে বিদ্যুৎকেন্দ্র সেখানে হতে পারে, নতুবা হবে না।

সুন্দরবনের পাশে নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করছেন। একই অঞ্চলে আরেকটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের যৌক্তিকতা বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ারপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রন হক শিকদার জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লা দিয়ে চলবে। তাদের প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি ফার্নেস অয়েলে চলবে। ফলে এখানে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। এরপরও তারা ইআইএ রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। পরিবেশগত ছাড়পত্র পেলেই প্রকল্প এগোবে। তিনি বলেন, পাওয়ারপ্যাক দেশের প্রচলিত আইন মেনেই শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। আইনের বাইরে কিছু করবে না।

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। তাদের দাবি- রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রর কারণে সুন্দরবন ও তার আশপাশের পরিবেশ, বায়ু ও পানি দূষিত হবে, যা ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। এখন সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে আরেকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিষয়ে জানতে চাইলে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, রামপাল কেন্দ্রের বিরোধিতা করছে সবাই। তারপরও সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। এখন আরও বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। মূলত সরকার বুঝতে চাচ্ছে না- দক্ষিণাঞ্চলের রক্ষাকবচ এই সুন্দরবনের কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে।

সুন্দরবনকে ১৯৯৯ সালে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ইউনেস্কো। সুন্দরবন এলাকায় রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে জাতিসংঘের এ সংস্থা। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো ও আইইউসিএনের একটি যৌথ পর্যবেক্ষণের পর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার প্রস্তাব দিয়েছিল বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে। তবে সরকার সব সময় দাবি করে আসছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন করবে না। সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্ট ইউনেস্কো সুন্দরবনকে ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ক একটি প্রতিবেদন গত ৭ জুন ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের বার্ষিক সভা আগামী ৩০ জুন থেকে ১০ জুলাই আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় ইউনেস্কোর সুপারিশ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নতুন করে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন ইউনেস্কোকে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করতে পারে।

 

সর্বশেষ সংবাদ